বাংলাদেশ ক্রিকেটে যেন বিশৃঙ্খলা পিছু ছাড়ছেই না। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ থেকে হতাশাজনক বিদায়ের পর এবার আবারও বিতর্কে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)। টুর্নামেন্ট শেষ হতেই নতুন করে সামনে এসেছে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিযোগ।
বিপিএলের ১২তম আসর শেষ হওয়ার পর গভর্নিং কাউন্সিল সব ফ্র্যাঞ্চাইজির কাছে বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে। ২৭ জানুয়ারি পাঠানো ওই চিঠিতে ১৫ দিনের মধ্যে সব পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
খেলোয়াড়দের ক্ষোভ, পুরনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি
বিপিএলে পারিশ্রমিক জট নতুন কিছু নয়। আগের আসরগুলোতেও বারবার দেখা গেছে বিলম্ব বা পুরো টাকা না পাওয়ার ঘটনা। এমনকি অতীতে খেলোয়াড়রা পারিশ্রমিক না পেয়ে দল ছাড়তেও বাধ্য হয়েছেন।
এক পর্যায়ে আর্থিক সংকটে পড়ে মালিকানা ছেড়ে দেয় চট্টগ্রাম রয়্যালস। এবারের আসর শেষ হওয়ার পরও একই চিত্র। বেশ কয়েকটি দলের খেলোয়াড় এখনো পুরো পারিশ্রমিক পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
নোয়াখালী এক্সপ্রেসের এক খেলোয়াড় নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানান, ফ্র্যাঞ্চাইজি তাদের মোট পারিশ্রমিকের মাত্র ২৫ শতাংশ পরিশোধ করেছে। বাকি ৭৫ শতাংশ এখনো বকেয়া। আরও গুরুতর বিষয় হলো, ২০ জানুয়ারি খেলোয়াড়দের দেওয়া চেক বাউন্স করেছে।
ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, “আপনি অন্য খেলোয়াড়দের কাছেও জিজ্ঞেস করতে পারেন। ২০ জানুয়ারি আমাদের সবার চেক বাউন্স করেছে।”
২০২৫–২৬ মৌসুমে বিপিএলে নতুন দল হিসেবে যাত্রা শুরু করে নোয়াখালী এক্সপ্রেস। দলের একাধিক খেলোয়াড় একই অভিযোগ করেছেন, যদিও তারা এখনো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ওপর আস্থা রাখছেন।
ওই খেলোয়াড় আরও বলেন, “বিসিবি আমাদের কাছে পারিশ্রমিকের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছে। আমরা আশা করছি খুব শিগগিরই বাকি টাকা পরিশোধ করা হবে।”
একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজিতে একই চিত্র
নোয়াখালীর পাশাপাশি ঢাকা ক্যাপিটালসের খেলোয়াড়রাও জানিয়েছেন, টুর্নামেন্ট চলাকালীন তারা মাত্র ২৫ শতাংশ পারিশ্রমিক পেয়েছেন। পরে অল্প কিছু টাকা যোগ হলেও পুরো বকেয়া এখনো মেটানো হয়নি। গত সপ্তাহে ঢাকা ক্যাপিটালস কর্তৃপক্ষ জানায়, চলতি সপ্তাহেই সব পাওনা পরিশোধ করা হবে।
অন্যদিকে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স খেলোয়াড় ও স্টাফদের সব পারিশ্রমিক পরিশোধ করেছে। রংপুর রাইডার্সও তাদের সব দেনা শোধ করেছে বলে জানিয়েছে।
তবে সিলেট টাইটান্সের এক খেলোয়াড় জানান, তিনি এখনো মাত্র ৫০ শতাংশ টাকা পেয়েছেন। আর মালিকানা বাতিল হওয়া চট্টগ্রাম রয়্যালসের খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক বিসিবি পরিশোধ করবে বলে জানা গেছে।
বিসিবির আশ্বাস
বিপিএল সদস্য সচিব ইফতিখার রহমান মিঠু স্বীকার করেছেন, কয়েকটি ফ্র্যাঞ্চাইজি এখনও পারিশ্রমিক পরিশোধে পিছিয়ে আছে। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন, প্রয়োজনে ব্যাংক গ্যারান্টি ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি ব্যবহার করে সব বকেয়া পরিশোধ করা হবে।
তিনি বলেন, “নোয়াখালীর মোট বকেয়া প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। তাদের কাছ থেকে আমাদের কাছে ২ কোটি টাকা ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি রয়েছে। ঢাকার ক্ষেত্রে ৫ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি আছে। চেক বাউন্স হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের হাতে খেলোয়াড়দের পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “২৭ তারিখ আমরা চিঠি দিয়েছি। ১৫ দিনের মধ্যে সব ফ্র্যাঞ্চাইজিকে পরিশোধ সম্পন্ন করে খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও ম্যানেজমেন্টের তালিকা দিতে হবে। আমরা প্রত্যেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তা যাচাই করব।”
বিপিএলের পুরনো ক্ষত
২০১২–১৩ মৌসুমে যাত্রা শুরুর পর থেকেই বিপিএলে পারিশ্রমিক সংকট নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম আসরেই অনেক খেলোয়াড় পুরো বেতন পাননি। সেই মৌসুমে সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল জড়িত স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারির কারণে এক মৌসুমের জন্য টুর্নামেন্ট স্থগিতও হয়েছিল।
২০২৪–২৫ মৌসুমে দুর্বার রাজশাহী খেলোয়াড়রা বেতন, দৈনিক ভাতা ও হোটেল বিল না পাওয়ায় ম্যাচ বয়কট করেন, যা বড় বিতর্কের জন্ম দেয়।
সব বিতর্কের মধ্যেও সর্বশেষ আসর শেষ হয় এবং রাজশাহী ওয়ারিয়র্স শিরোপা জেতে। তবে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের বিতর্কিত বিদায় এবং আইসিসি ও বিসিসিআইয়ের সঙ্গে টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে বিপিএলের এই পারিশ্রমিক কেলেঙ্কারি দেশের ক্রিকেটকে আবারও অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলেছে।



0 coment rios: